Logo
শিরেোনাম ::
সিমোশএমসিতে ইন্টার্ন ডক্টরস রিসেপশন সম্পন্ন বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচন-২০২২ তানোরে চোলাই মদ ও পলাতক আসামি গ্রেফতার হাজীগঞ্জ শাহরাস্তিতে ইঞ্জিঃ মোহাম্মদ হোসাইনের শীতবস্ত্র বিতরন বটবৃক্ষের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরন ডুয়েটে অনুষ্ঠিত হলো “শহীদ মোস্তফা এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২১” শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরন করলেন ইঞ্জিঃ মোহাম্মদ হোসাইন পটিয়া উপজেলায় বিভিন্ন এতিমখানার ছাত্রদের মাঝে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা বদিউল আলমের শীতবস্ত্র বিতরণ শাহজাদপুর প্রিমিয়ার লীগ সিজন-২ শুরু ফিরিঙ্গী বাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের উদ্যোগে ছাত্রলীগের ৭৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে

চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসন্ধানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর

মাসঊদ জালাল, জুড়ী প্রতিনিধি / ৫৩৩ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

মাসঊদ জালাল, জুড়ী প্রতিনিধিঃ

জুড়ীতেই ছিল অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। নানা বিষয় পড়ানো হতো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বিষয়টি শুনতে আশ্চর্য লাগলেও মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলায় এক বৌদ্ধ রাজার বসবাস ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেই চন্দ্র বংশীয় বৌদ্ধ রাজা শ্রীচন্দ্র খ্রিস্টীয় দশম শতকের প্রথম দিকে আনুমানিক ৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান জুড়ী উপজেলার সাগরনাল গ্রামে ‘চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

কালের বির্বতনে এটি হারিয়ে গেলেও সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নতুন আগ্রহ আর আলোচনার। বিষয়টি জানতে পেরে নড়েচড়ে বসেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এ বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।‌

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হান্নান মিয়া (অতিরিক্ত সচিব) জানান, মন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি আমাকে জানানোর পর আমি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। আমি আমার আঞ্চলিক পরিচালককে বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলেছি। প্রাথমিক তদন্তে কিছু পেলে আমরা পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আমরা যদি এটা উন্মোচন করতে পারি তবে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, আমার কাছে তথ্য আছে রাজা শ্রীচন্দ্র বিক্রমপুর এলাকায় ছিলেন। সেখানে তার শ্রীহট্ট মন্ডল ছিল। সেখান থেকে তিনি মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন আর যুদ্ধ যেহেতু করেছিলেন নিশ্চয়ই সেখানে স্থাপনা রয়েছে। স্থাপনা থাকার সম্ভাবনা বেশি।
সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর আঞ্চলিক পরিচালক ড. আতাউর রহমান বলেন, তথ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশ মতে আগামী ২২ ও ২৩ জুলাই সরেজমিন তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিবেদন জমা দিব।

ভারতবর্ষে তাম্রশাসনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে তাম্রশাসন ছিল তামার পাতে লিখিত দলিল। রাজা-বাদশারা বিভিন্ন রাজকীয় নির্দেশ তামার পাতে খোদাই করে রাখতেন। চন্দ্রবংশীয় বৌদ্ধ রাজা শ্রীচন্দ্র এই তাম্রশাসন প্রদান করেছিলেন। চন্দ্র রাজবংশের রাজাদের মধ্যে শ্রী চন্দ্র ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ রাজা।

ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদারের ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থ মতে- শ্রী চন্দ্রের শাসনামল ছিল ৯০৫-৯৫৫ সাল পর্যন্ত। তাঁর সাম্রাজ্যেভুক্ত এলাকার মধ্যে ছিল মানিকগঞ্জ, ঢাকা ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী এলাকা, শ্রীহট্ট অঞ্চল ও কুমিল্লা। যার রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। মৌলভীবাজার জেলায় ১৯৬১ সালে একটি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়। যেটির তথ্য মতে আনুমানিক ৯৩৫ খ্রি: শ্রীহট্টে সম্পূর্ণ রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন রাজা শ্রীচন্দ্র।
বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ কমলাকান্ত গুপ্ত চৌধুরী তার ‘Copper plates of Sylhet’ গ্রন্থে তাম্রশাসন সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।

লেখক ও ব্যাংকার অমিতাভ পাল চৌধুরী তার এক প্রবন্ধে সুজিত চৌধুরীর ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস, নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব), মো: জহিরুল হক ও বায়োজিত আলমের ‘প্রাচীন সিলেটের চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় : একটি ইতিহাসভিত্তিক পর্যালোচনা’ শিরোনামের গবেষনা প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, শ্রীচন্দ্রের সাম্রাজ্য অনুসারে এতদঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মৌলভীবাজার জেলায় আবিষ্কৃত তাম্রশাসন অনুযায়ী খ্রিস্টীয় দশ শতকের প্রথম ভাগে উত্তরে কুশিয়ারা নদী, দক্ষিণ ও পশ্চিমে মনু নদী এবং পূর্বে ইন্দেশরের পাহাড়ি অঞ্চল বা পাথরিয়া অঞ্চল এই সীমানার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল। সেই হিসেবে মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের দীঘিপাড় এলাকাকে ইঙ্গিত করা‌। কারণ এখানে এককালে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এই জনশ্রুতির পাশাপাশি এ এলাকায় মাটির নিচে এখনও প্রাচীনকালের তৈরী বড় বড় ইট পাওয়া যায়।

উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, চন্দ্র রাজবংশ দশম ও একাদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে শাসন করা একটি বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাজবংশ ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের এই রাজবংশ মূলত বাংলার সমতট অঞ্চল ও উত্তর আরাকান শাসন করত। চন্দ্র রাজবংশের শাসনকাল দশম ও একাদশ শতাব্দীর মধ্যে ছিল। চন্দ্র রাজবংশের পাঁচজন উল্লেখযোগ্য রাজার মধ্যে শ্রীচন্দ্র ছিলেন চন্দ্র রাজবংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজা। তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর শৌর্য-বীর্য ও সাফল্যের সঙ্গে রাজত্ব করেন। সমগ্র বঙ্গ এবং উত্তর-পূর্বে কামরূপ পর্যন্ত চন্দ্রদের ক্ষমতা সম্প্রসারণের কৃতিত্ব শুধুই শ্রীচন্দ্রের।
মৌলভীবাজার জেলার পশ্চিমভাগে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসনে কামরূপ অভিযান সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। একই তাম্রশাসনে তাঁর উদ্যোগে সিলেট এলাকায় বিপুলসংখ্যক ব্রাহ্মণের বসতি স্থাপনের কথা জানা যায়। তিনি গৌড়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। দ্বিতীয় গোপাল এর শাসনকালে পালদের ক্ষমতা রক্ষাকল্পে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভূমিদান সম্পর্কিত তাঁর ৬ টি তাম্রশাসন এবং তাঁর উত্তরাধিকারীদের তাম্রশাসনে শ্রীচন্দ্র সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে বঙ্গ ও সমতটের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল।

রাজা শ্রীচন্দ্রের পশ্চিমবঙ্গ তাম্রশাসন বা সিলেট তাম্রশাসনটিও (৯২৫-৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ) বাংলায় কম্বোজ শাসকদের শাসনকালে জারিকৃত একটি লিখিত দলিল। চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রী চন্দ্র (৯২৫-৯৭৫ খ্রি.) এই তাম্রশাসনটি জারি করেন। এতে সমতট দেশের খিরোদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল দেবপর্বত-এর নাম উৎকীর্ণ এবং রাজা শ্রীচন্দ্রের পিতা রাজা তৈলক্যচন্দ্র কর্তৃক (৯০৫-৯২৫ খ্রি.) কম্বোজদের পরাজিত করার তথ্য বিধৃত। তাম্রলিপিটি পাঠোদ্ধার করে তাকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন আহমেদ হাসান দানী সম্পূর্ণ লিপিটি থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, লালমাই বনাঞ্চল হতে কম্বোজদের সৈন্য সমতট অঞ্চলে আক্রমণ করেছিল এবং চন্দ্র বংশীয় রাজা তৈলক্যচন্দ্র তাদের পরাজিত করে লালাম্বী রক্ষা করেছিলেন।
প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের মাধ্যমে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেলে তা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের মধ্যে ইতিহাস হয়ে থাকবে।
এই বিষয়টি অবগত হওয়ার পর জুড়ী উপজেলার যেসকল ব্যক্তিবর্গ রহস্য উদঘাটনের পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও সফলতা কামনা করি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com
P